শাস্তি, চাকরিচ্যুতি বা বাধ্যতামূলক অবসরের পর সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে কর্মকর্তাদের পুনরায় স্ব-পদে ফিরিয়ে আনার পুরোনো রেওয়াজ বাংলাদেশে আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর এভাবে প্রশাসনিক শাস্তি বাতিল করার প্রবণতা দিন দিন এক চিরচেনা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নজিরবিহীন আন্দোলনে অংশ নিয়ে শাস্তির মুখে পড়া ২০ কর্মকর্তার শাস্তি রাষ্ট্রপতির আদেশে মওকুফ করার পর এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
শাস্তি মওকুফ ও পুনর্বহালের সাম্প্রতিক চিত্র
সরকারি চাকরিতে বরখাস্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার ইতিহাস দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের বহু বড় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে:
- এনবিআরের কর্মকর্তাদের ছাড়: ২০২৫ সালের জুনে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে কাজ বন্ধ করে আন্দোলন করা এবং প্রকাশ্য বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলা এনবিআরের ২০ জন কর্মকর্তার সাময়িক বরখাস্ত ও বেতন কর্তনের দণ্ড সম্প্রতি মওকুফ করা হয়।
- সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে রাজনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করে ১ জুলাই সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক ১৫ জন বরখাস্ত বা অপসারিত কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও স্বাভাবিক অবসরের সুবিধা দেওয়া হয়।
- নির্বাচন কর্মকর্তা ও পুলিশে পুনর্বহাল: ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চাকরিচ্যুত ৮৫ জন নির্বাচন কর্মকর্তাকে ২০২৫ সালের অগাস্টে স্বপদে পুনর্বহাল করে কমিশন। একইসাথে পূর্ববর্তী মেয়াদে চাকরি হারানো অন্তত ১,৫২২ জন পুলিশ সদস্যকে চাকরিতে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আইনের কড়াকড়ি বনাম সরকারের দ্বিমুখী অবস্থান
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা জোরদার করতে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন-২০২৬’ পাস করা হয়েছে। এই আইনে জনসেবা ব্যাহত করার মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে জনসেবা বিঘ্নকারীদের জন্য কঠোর আইনের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে সরকারি আদেশ অমান্য করা কর্মকর্তাদের ক্ষমা প্রদান প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিধানে সরকারের দ্বিমুখী অবস্থানকেই স্পষ্ট করে তোলে।
‘একদিকে ফেরানো, অন্যদিকে সরানো’ ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন
সরকার বদলের পর প্রশাসনিক প্রতিহিংসা মিটাতে ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর ৪৫ ধারা ব্যবহার করে ২৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়া কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানো ছাড়াই ‘জনস্বার্থে’ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কৌশল নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি বহু জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে বা ওএসডি করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট বিচারিক আইনি প্রক্রিয়া (প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল বা আপিল বিভাগ) এড়িয়ে কেবল সরকার পরিবর্তনের রাজনৈতিক আনুকূল্যে সিদ্ধান্ত বাতিলের এই ধারা আমলাতন্ত্রকে আরও বেশি রাজনীতিকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতামত
সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, “রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে সরিয়ে দিলে পরবর্তী সরকার এলে তাদের ফিরে আসার পথ তৈরি হয়। আর রাজনৈতিক অনুকম্পায় কাউকে ফিরিয়ে আনলে তা আমলাতন্ত্রে ক্যাডার বা দলীয় দৌরাত্ম্যকে আরও শক্তিশালী করে।” জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, “আইনি ও বিভাগীয় প্রক্রিয়া ছাড়া স্রেফ সরকার বদলের পর রাজনৈতিক আনুকূল্যে কাউকে চাকরিতে বসানো সরাসরি অনিয়ম। এই ধারা বন্ধ না হলে দেশে পেশাদার ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়।”
প্রশাসনিক এই অস্থিরতার সংস্কৃতি কেবল ব্যক্তির চাকরি পাওয়ার বিষয় নয়, এর সাথে জড়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এবং সার্বিক আইনি ব্যবস্থার অস্তিত্ব।



