Homeমতামতপ্রবাসীদের অধিকার-মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী

প্রবাসীদের অধিকার-মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী

প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সম্পদের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।

তিনি বলেন, নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা, বিদ্যমান বাজার সম্প্রসারণ এবং দেশের কর্মীদের দক্ষ করে বিদেশে পাঠানোর ওপরও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রণালয়ের গত ছয় মাসের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

মো. নুরুল হক বলেন, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্পদের সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ চলছে।

তিনি জানান, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিদ্যমান শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ কর্মী পাঠানো, বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসের সেবার পরিধি বাড়ানো এবং কর্মী পাঠানোর নামে প্রতারণা বন্ধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের সব ফলাফল স্বল্প সময়ে দৃশ্যমান করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, ফলোআপ আলোচনা, সমঝোতা স্মারকসহ (এমওইউ) বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন হয়। ফলে ছয় মাসে নেওয়া অনেক উদ্যোগের সুফল এখনো দৃশ্যমান না হলেও আগামী দিনে এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা

গত ছয় মাসে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে। আগামী মাসের শুরু থেকেই বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা জটিলতা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে সেই জটিলতা কাটিয়ে ওঠার পথ তৈরি হয়েছে। শ্রমবাজারটি পুনরায় চালু হওয়া দেশের কর্মপ্রত্যাশীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

দুবাই ও কাতারে কর্মসংস্থানের সুযোগ

দুবাইয়ের শ্রমবাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০১২ সালের পর দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার প্রবণতা কমে গেলেও বর্তমানে নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তিনি জানান, চলতি বছরের মধ্যেই ‘দুবাই ট্যাক্সি’ নামে একটি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার চালক নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি চালকদের জন্য বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল বেশি সংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠানো নয়; বরং কর্মীর দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। এতে কর্মীদের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্সের প্রবাহও বাড়বে।

কাতারের সঙ্গেও শ্রমবাজার সম্প্রসারণের আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। কাতারের শ্রমমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইলেকট্রিক্যাল, এসি ও অন্যান্য কারিগরি খাতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।

কাতারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের পাঁচটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষ কর্মী তৈরি করে কাতারে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

দক্ষ কর্মী তৈরিতে গুরুত্ব

বিদেশি শ্রমবাজারে অদক্ষ কর্মীর চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে উল্লেখ করে মো. নুরুল হক বলেন, যে দেশের যে ধরনের কর্মীর প্রয়োজন, সেই চাহিদা অনুযায়ী দেশে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

সৌদি আরবের শ্রমবাজার নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। জানান, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের আমন্ত্রণ এসেছে। এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে সরকার।

তিনি বলেন, আগামী কয়েক বছরে সৌদি আরবে বিশ্বকাপসহ বেশ কিছু বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন ও প্রকল্প রয়েছে। এসব আয়োজনকে কেন্দ্র করে নির্মাণ, পরিবহন, সেবা, পর্যটন, প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিপুলসংখ্যক কর্মীর চাহিদা তৈরি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

বাহরাইন, জাপান ও থাইল্যান্ডে নতুন বাজারের চেষ্টা

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বাহরাইনের শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ের সফরের মাধ্যমে এ বিষয়ে আরও অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলেও নতুন শ্রমবাজার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের যাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি থাইল্যান্ডের সঙ্গে সমঝোতা ও আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।

থাইল্যান্ডের শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হলে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী। আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিদেশে মৃতদের মরদেহ দেশে ফেরাতে সরকারি উদ্যোগ

প্রবাসীদের জন্য সরকারের অন্যতম মানবিক উদ্যোগ হিসেবে বিদেশে মারা যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ সরকারি খরচে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ে যেসব আবেদন এসেছে, সেগুলোর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে বিদেশে মারা যাওয়া প্রবাসীদের মরদেহ বিনা খরচে দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

বিদেশে কর্মরত কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে তার পরিবার যেন আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় না পড়ে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

মরদেহ দেশে আনার পর পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পরিবহন ব্যবস্থাও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, আগে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স ও ফ্রিজিং ব্যবস্থা থাকলেও দায়িত্ব নেওয়ার পর আরও দুটি যুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রবাসীর মরদেহ দ্রুত ও সম্মানের সঙ্গে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী এ সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে।

আগামী মাসে চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’

প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা, সম্পদের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং ও পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে যুক্ত করে আগামী মাসেই প্রবাসী কার্ড চালু করা হবে।

এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা ১১টি বিশেষ সেবায় অগ্রাধিকার পাবেন। এতে সরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে তাদের সময় ও হয়রানি কমবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।

কার্ডটির সঙ্গে একটি ডিজিটাল অ্যাপ যুক্ত থাকবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে কোনো প্রবাসী কোন দেশে অবস্থান করছেন এবং তিনি দূতাবাস বা মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো সেবার আবেদন করেছেন কি না, তা অনুসরণ করা যাবে।

কোনো সেবা চাওয়ার পর সেটি দেওয়া হয়েছে কি না, সেই তথ্যও ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে। ফলে কোনো আবেদন দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

দূতাবাসের সেবায় জবাবদিহিতা

বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর সেবা বাড়াতেও নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশের বাইরে থাকা প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের প্রতি সরকারের সমান দায়িত্ব রয়েছে। পেশা, আয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে প্রয়োজনের সময় প্রত্যেককে সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রচলিত কূটনীতির পাশাপাশি ‘কালচারাল ডিপ্লোমেসি’ ও ‘লেবার মাইগ্রেশন ডিপ্লোমেসি’র ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রতারণা বন্ধে চাহিদাপত্র যাচাই কঠোর

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতারণা বন্ধে ডিমান্ড লেটার বা কর্মী চাহিদাপত্র যাচাই আরও কঠোর করা হয়েছে বলে জানান মো. নুরুল হক।

তিনি বলেন, কোন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে চাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে কার্যকর কি না, সেখানে কর্মপরিবেশ কেমন এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কী ধরনের সুযোগ রয়েছে—এসব বিষয় সরেজমিনে যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শ্রমবাজারের নামে কোনো ধরনের প্রতারণা বা সিন্ডিকেট যেন প্রবাসী কর্মীদের ক্ষতির কারণ হতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা, দূতাবাসের জবাবদিহিতা এবং প্রবাসীদের সম্পদের সুরক্ষার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান আরও বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে নেওয়া উদ্যোগগুলোর সুফল শিগগিরই দৃশ্যমান হবে এবং নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আরও অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

জনপ্রিয় সংবাদ

সাম্প্রতিক মন্তব্য