ইরানের ওপর আরও কার্যকর চাপ সৃষ্টি এবং সম্ভাব্য ‘শাস্তিমূলক’ পদক্ষেপ নির্ধারণে মার্কিন সামরিক বাহিনী নিজেদের সদস্যদের কাছ থেকেই নতুন ও ব্যতিক্রমী কৌশলের প্রস্তাব আহ্বান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর একটি অভ্যন্তরীণ ই-মেইলের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে সেন্টকমের গোয়েন্দা শাখার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সামরিক বিশ্লেষকদের উদ্দেশে পাঠানো এক ই-মেইলে ইরানকে আরও কার্যকরভাবে চাপে রাখতে ‘সৃজনশীল’ এবং ‘প্রচলিত চিন্তার বাইরে’ নতুন ধারণা দেওয়ার আহ্বান জানান। বিষয়টি ই-মেইলটির সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ‘ক্রাউডসোর্সিং’ পদ্ধতিতে সামরিক কৌশল আহ্বান করা অস্বাভাবিক। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে নিজেদের শর্তে আলোচনার টেবিলে আনতে বিদ্যমান কৌশলগুলো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।
সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, সেন্টকম সবসময় উদ্ভাবনী চিন্তাকে উৎসাহিত করে। তার ভাষায়, অ্যাডমিরাল কুপার পদমর্যাদা নির্বিশেষে সদস্যদের কাছ থেকে নতুন ধারণা গ্রহণের মাধ্যমে কার্যক্রম আরও কার্যকর করার চেষ্টা করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ওই ই-মেইলের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিলেও পরে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক নেতাদের আহ্বানে তা স্থগিত করেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালালেও এখন পর্যন্ত কূটনৈতিক অগ্রগতির কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব স্থাপনায় পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাদান ও সরঞ্জাম রয়েছে। তবে গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত হওয়ায় শুধু বিমান হামলায় সেগুলো ধ্বংস করা কঠিন বলে মনে করছেন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা।
সূত্রগুলোর মতে, এসব স্থাপনা সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর করতে স্থলবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এতে বড় ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
আরেকটি সূত্রের দাবি, ট্রাম্প এমন একটি প্রতীকী সামরিক অভিযানের কথাও বিবেচনা করছেন, যার উদ্দেশ্য হবে দৃশ্যমান সামরিক সাফল্য দেখিয়ে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা। তবে এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য অর্জিত নাও হতে পারে।
এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমান বিমান হামলা ইরানের আলোচনার অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে না। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। গত মাসে আইনপ্রণেতাদের তিনি বলেন, বিমান শক্তিরও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের বিবেচনায় থাকা সামরিক বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে এক থেকে দুই সপ্তাহব্যাপী ব্যাপক বিমান অভিযান, যার লক্ষ্য হবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা। তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত, সম্ভাব্য বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় এখনো এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এছাড়া স্থলবাহিনী মোতায়েন কিংবা ইরানের কৌশলগত খার্গ দ্বীপ দখলের মতো বিকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এমন পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি—বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে মার্কিন সেনা না পাঠানোর অঙ্গীকার—এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী পাল্টাপাল্টি সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব হরমুজ প্রণালি এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমরা জিততে চাই। আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানব। একসময় তারা বলবে, আমরা আর সহ্য করতে পারছি না।”


