২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৬৭ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সব্যসাচী লেখক ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ। দুই দুইবার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পরও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নতুন ধারার প্রবন্ধ ও সৃজনশীল সাহিত্যে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ষাট দশকের প্রভাবশালী এই সাহিত্যিকের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যজগতে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যা আজও অমলিন। জীবনযাত্রার শুরুতে প্রথাবিরোধী লেখামালার কারণে বিশেষত বাম ধারার সমালোচকদের তীব্র কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। নিজস্ব অর্থায়নে বই প্রকাশ করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলেও, জীবনের শেষভাগে তিনি স্বীয় যোগ্যতাবলে অধিকাংশ সম্পাদক ও পাঠকদের কাছে এক অপরিহার্য লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
বাংলা কবিতায় এক সম্পূর্ণ নতুন ও অনন্য রীতির প্রবর্তন করেছিলেন মান্নান সৈয়দ। ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ ও পরবর্তীতে ‘পরাবাস্তব কবিতা’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম পরাবাস্তববাদী কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর কবিতার পৃথক কাব্যভাষা ও রূপকল্প বাংলা কবিতা সংকলনের জন্য অত্যন্ত মৌলিক সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
কবিতার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর গদ্যশৈলী বাংলা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বৈচিত্র্যময় ও বহুলপ্রজ গদ্য রচনায় বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে তাঁর তুলনামূলক আলোচনা উঠে আসে। কোনো রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংকীর্ণতায় না ভুগে তিনি জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, বিষ্ণু দে এবং ফররুখ আহমদের মতো বিপরীতমুখী সাহিত্যিকদের নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করেছেন।
বাংলাদেশে কবি জীবনানন্দ দাশকে নতুন করে পাঠকের সামনে তুলে ধরার মূল কুশলী ছিলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। তাঁর রচিত ‘শুদ্ধতম কবি’ জীবনানন্দ গবেষণায় এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও এই গ্রন্থের প্রশংসায় উল্লেখ করেছিলেন যে, এটি প্রথাগত অধ্যাপকসুলভ আলোচনা নয়, বরং এক অসাধারণ সাহিত্যিক ব্যবচ্ছেদ।
একইভাবে বিষ্ণু দে-কে অনুধাবনে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্যের কারণে কলকাতায় কবির জন্মশতবার্ষিকী উদ্বোধনের মতো বিরল সম্মাননা অর্জন করেছিলেন তিনি, যা বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের জন্য পরম গৌরবের। এছাড়া ‘করতলে মহাদেশ’, ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’ এবং বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা’ তাঁর সাহিত্যিক নিরপেক্ষতা ও গভীর অনুভূতির অনন্য নিদর্শন।
প্রবন্ধ ও গবেষণার পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও মান্নান সৈয়দের বিশেষ পদচারণা ছিল। ষাট দশকের ভাষাচর্যাপ্রধান ও ব্যক্তিবাদী গল্পরীতির অন্যতম ধারক ছিলেন তিনি। তাঁর রচিত ‘অ-তে অজাগর’ ও ‘পোড়ামাটির কাজ’-এর মতো উপন্যাসগুলো সাহিত্যের পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে প্রথাবিরোধী ও জটিল মনে হলেও তাঁর প্রবন্ধ ও সাহিত্যিক কাজগুলো বর্তমান ও ভবিষ্যতের পাঠকদের কাছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে অক্ষয় হয়ে থাকবে।



