Homeসংস্কৃতিমক্কা ও মদিনায় সুলতানি বাংলার ঐতিহাসিক স্বাক্ষর: 'আল মাদরাসাতুল গিয়াসিয়া আল বাঙ্গালিয়া'

মক্কা ও মদিনায় সুলতানি বাংলার ঐতিহাসিক স্বাক্ষর: ‘আল মাদরাসাতুল গিয়াসিয়া আল বাঙ্গালিয়া’

মধ্যযুগে বাংলা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক শাসনাঞ্চল ছিল না, বরং রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ইসলামি দুনিয়ায় এক উজ্জ্বল নাম ছিল। এর অন্যতম ঐতিহাসিক উদাহরণ মক্কা ও মদিনার পবিত্র ভূমিতে সুলতানি বাংলার শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—‘আল মাদরাসাতুল গিয়াসিয়া আল বাঙ্গালিয়া’ (গিয়াসিয়া মাদরাসা)। ১৩৮৯ থেকে ১৪১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করা ইলিয়াস শাহি বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই সুলতান কেবল তলোয়ার দিয়ে রাজ্য শাসন করেননি; বরং দূরদর্শী কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় অনন্য অবদান রেখে গেছেন।

১৪১০ খ্রিষ্টাব্দে (৮১৩ হিজরি) সুলতানের প্রতিনিধি ইয়াকুত গিয়াসি মক্কার মসজিদুল হারামের ‘বাবে উম্মে হানি’র কাছে জমি ও বাড়ি কিনে এই মাদরাসা স্থাপন করেন। এর খরচ জোগাতে ১২ হাজার মিসকাল স্বর্ণমূল্যে দুটি বাগান এবং ৫০০ মিসকাল স্বর্ণ দিয়ে একটি বাড়ি কিনে তা ওয়াক্ফ করা হয়েছিল। মক্কায় এটিই ছিল প্রথম মাদরাসা যেখানে ইসলামের ৪টি প্রধান মাজহাবের পাঠদান পরিচালিত হতো। মসজিদে নববির ‘বাবুস সালাম’-এর কাছে ‘হুসনুল আতীক’ নামক একটি প্রাচীন দুর্গ ক্রয় করে আরেকটি শাখা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন সুলতানের অপর প্রতিনিধি হাজি ইকবাল। সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ মক্কা-মদিনার অধিবাসীদের জন্য উপঢৌকন পাঠানোর পাশাপাশি আরাফাত ময়দানে হাজিদের পানীয় জল সংকট নিরসনে ৩০ হাজার মিসকাল স্বর্ণ প্রদান করে খাল পুনর্খনন ও সংস্কার করেছিলেন।

গিয়াসিয়া মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক রূপরেখা

বিষয় বিবরণ ও কাঠামো
শিক্ষাপদ্ধতি চার মাজহাব (হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি) ভিত্তিক সমন্বিত পাঠদান।
শিক্ষার্থী কোটা মোট আসন ৬০টি (শাফেয়ি: ২০, হানাফি: ২০, মালেকি: ১০ এবং হাম্বলি: ১০)।
শিক্ষকবৃন্দ তৎকালীন বিখ্যাত আলেম জামালুদ্দিন শাফেয়ি, শিহাবুদ্দিন হানাফি, তাকিউদ্দিন মালেকি এবং সিরাজুদ্দিন হাম্বলি।
আর্থিক ব্যবস্থাপনা ওয়াক্ফ এস্টেট থেকে অর্জিত আয় দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসন, ভাতা, অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটানো হতো।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের মৃত্যুর পর নিয়মিত অর্থায়ন বন্ধ হওয়া, মক্কার তৎকালীন শরিফ হাসান ইবনে আজলানের প্রশাসনিক শিথিলতা এবং পরবর্তীকালে হারামাইন শরিফাইনের সম্প্রসারণ কাজের ফলে ঐতিহাসিক এই বিদ্যাপীঠটি কালের গহ্বরে বিলীন হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও চীন, পারস্য ও জৌনপুরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা সুলতান গিয়াসউদ্দীনের এই বিরল উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, মধ্যযুগীয় বাংলা জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় উদারতায় বিশ্বমঞ্চে স্বমহিমায় ভাস্বর ছিল।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় সংবাদ

সাম্প্রতিক মন্তব্য