বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার একটি কঠিন কিন্তু বাস্তব সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আস্থা হারিয়ে গেলে কেবল বাগাড়ম্বর, প্রতিশ্রুতি কিংবা অতীতের ত্যাগের স্মৃতিচারণ দিয়ে সেই আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায় না। নাগরিক সমাজ শেষ পর্যন্ত সরকারের স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং সার্বভৌম জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তার দৃশ্যমান পদক্ষেপ দিয়েই সফলতা ও ব্যর্থতার বিচার করে।
অতীতের ঘটনা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদসহ অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে সালাহউদ্দিন আহমেদের অতীতের নিখোঁজ হওয়া, ভারতে অবস্থান এবং দীর্ঘ সময় পর দেশে প্রত্যাবর্তনের ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গুম, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানের স্বার্থেই এসব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ সত্য জনগণের সামনে আসা জরুরি।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন যে বর্তমান সরকারের মেয়াদে কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি এবং অতীতের ঘটনাগুলো তদন্তের ওপর জোর দিয়েছেন। এই অবস্থান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হলেও, জনগণের আস্থা অর্জনে ঘোষণার পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের শনাক্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে আনা আবশ্যক।
ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক নির্ভরতা কখনো একই বিষয় হতে পারে না। কোনো অবস্থাতেই বন্ধুত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়, যেখানে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারের সুযোগ দেওয়া নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনাটি কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে বন্ধুত্বের বার্তা দেওয়া আর অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করার সুযোগ দেওয়া যে পরস্পরবিরোধী—এ অবস্থান জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে যৌক্তিক। তবে এই নীতির ধারাবাহিক প্রতিফলন প্রয়োজন সব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা প্রতিবেশী ভারত—পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হতে হবে কেবলই ‘বাংলাদেশের স্বার্থ’।
অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
অতীতের স্বৈরাচারী ধারা, দুর্নীতি, গুম ও প্রশাসনের দলীয়করণের অভিযোগ থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করার যে অঙ্গীকার বর্তমান সরকার করেছে, তার পরীক্ষা দিতে হবে বাস্তব কর্মকাণ্ডে:
- প্রশাসন ও পুলিশ: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরোপুরি প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ রাখা।
- বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা: বিরোধী মতের অধিকার রক্ষা এবং বিচারিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা।
- প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্ব: দলীয় আনুগত্যের বদলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া।
ইতিহাসের চরম সত্য
ইতিহাস প্রমাণ করে, কোনো সরকার যখন সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করে এবং জনগণের প্রশ্নকে অবজ্ঞা করে, তখন রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে টিকে থাকা গেলেও শেষ পর্যন্ত জনমতের বিচারে তাদের পতন ঘটে। ক্ষমতার মূল উৎস নিরাপত্তাবাহিনী বা রাজনৈতিক শক্তি নয়, বরং জনগণের বিশ্বাস।
বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান, অত্মপ্রশংসা ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সমালোচনা গ্রহণ এবং ভুল সংশোধনের রাজনৈতিক সাহস দেখাতে হবে। কারণ ক্ষমতার চেয়ে বড় কোনো শক্তি নাই যা জনগণের আস্থা ও বিচারের ঊর্ধ্বে।



