মোগল ও আফগান-পাঠান আমলের তুলনামূলক নমনীয় করব্যবস্থার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ সিলেটের অর্থনীতি ও জনজীবনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কোম্পানি সরকারের অতিরিক্ত করের চাপ ও শোষণের প্রতিবাদে ১৭৮২ সালে সিলেটে ব্রিটিশবিরোধী প্রথম সশস্ত্র গণবিস্ফোরণ ঘটে, যা ইতিহাসে ‘মহররমের বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। তৎকালীন ব্রিটিশ কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসে এটিকে সাধারণ ‘হাঙ্গামা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায়—সিলেট শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাসিন্দা এই ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
করবৃদ্ধির প্রেক্ষাপট ও জন অসন্তোষ:
- রাজস্বের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি: মোগল সম্রাট আকবরের আমলে সিলেটের বার্ষিক রাজস্ব ছিল ১,৪৭,৫৬৫ টাকা। কিন্তু ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর রাজস্ব দ্রুত বাড়িয়ে ১৭৭২ সালে ১,৭০,০০০ টাকা, ১৭৭৬ সালে ২,০০,০০০ টাকা এবং ১৭৭৮ সালে রবার্ট লিন্ডসের আমলে ২,৫০,০০০ টাকায় উন্নীত করা হয়।
- বিদ্রোহের সূত্রপাত: করের চাপে স্থানীয় জমিদার ও প্রজাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। ১৭৮২ সালে মহররমের ধর্মীয় সমাবেশের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় এক পিরজাদার নেতৃত্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
১৭৮২ সালের মহররম বিদ্রোহের সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ
| বিষয় | তথ্য ও বিবরণ |
| বিদ্রোহের বছর | ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দ (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন আমল)। |
| বিদ্রোহী নেতৃত্ব | নাম না জানা এক পিরজাদা (দলবলসহ প্রায় ৩০০ জন সদস্য)। |
| প্রধান প্রতিপক্ষ | সিলেটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসে ও কোম্পানি বাহিনী। |
| বিদ্রোহের স্থান | সিলেট শহরের নিকটস্থ একটি টিলা বা পাহাড়ি অঞ্চল। |
| সংঘর্ষের পরিণতি | অসম যুদ্ধে পিরজাদা ও তাঁর ভাইসহ একাধিক বিদ্রোহী শহিদ হন; সূচনা ঘটে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের। |
টিলার যুদ্ধ ও পিরজাদার আত্মত্যাগ:
মহররমের দিন বিকালে প্রায় ৩০০ জনের একটি দল নিয়ে পিরজাদা টিলার ওপর অবস্থান নিলে লিন্ডসে তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে সমতল ভূমিতে অবস্থান নেন। বিদ্রোহীদের কাছে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, কেবল তরবারি ও দেশীয় অস্ত্র ছিল। পিরজাদা সাহসিকতার সঙ্গে লিন্ডসের আত্মসমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে উচ্চারণ করেন—“আমরা কি ফিরিঙ্গিদের কুকুর যে তাদের হুকুম তামিল করব? আজ মারার অথবা মরার দিন।” তলোয়ারের লড়াইয়ের একপর্যায়ে কৌশল খাটিয়ে অতি কাছ থেকে পিরজাদাকে পিস্তল দিয়ে গুলি করেন লিন্ডসে। পরবর্তীতে উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র ও বেয়নটের মুখে সাধারণ অস্ত্রধারী বিদ্রোহীরা পরাজয় বরণ করলেও, সিলেটের মহররম বিদ্রোহ ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রথম ঐতিহাসিক সশস্ত্র প্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।



