২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; এটি ছিল ন্যায়বিচার, মেধার মূল্যায়ন, সম্মান এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জেগে ওঠার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এমন মন্তব্য করেছেন প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পাঠাও-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা ও কর্মজীবন কাটানোর পর দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পরে পাঠাওয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করেন।
তার ভাষ্য, ব্যবসার মূল লক্ষ্য শুধু মুনাফা অর্জন নয়; বরং মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা। এই বিশ্বাস থেকেই জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি নিজেকে নিরপেক্ষ দর্শক হিসেবে রাখতে পারেননি।
‘আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়’
ফাহিম আহমেদ বলেন, ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দৃশ্য দেখার পর তার উপলব্ধি হয়, আন্দোলনটি আর শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, ইন্টারনেট বন্ধ এবং তথ্যপ্রবাহের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তার মতে, তখন দেশের ভেতরে এবং বাইরে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছিল।
আন্দোলনের সমন্বয়কদের আশ্রয় দেওয়ার দাবি
তিনি জানান, কয়েকজন সাংবাদিকের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়কের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। পরে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে আব্দুল হান্নান মাসউদ, আব্দুল কাদেরসহ কয়েকজন সমন্বয়কের জন্য তিনি ও তার স্ত্রী নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।
তার দাবি, কয়েক দিন তারা তাদের বাসায় অবস্থান করে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ও যোগাযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
ফাহিম আহমেদ বলেন, সেই সময় পরিস্থিতি তাদের পরিবারের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবুও বিবেকের তাগিদ থেকেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তথ্য সমন্বয় ও ঘোষণাপত্র তৈরিতে সম্পৃক্ততার দাবি
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেশ-বিদেশে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি ২ আগস্ট ঘোষিত ‘এক দফা’ দাবির বাংলা ও ইংরেজি ভাষার খসড়া প্রস্তুতের কাজেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, আন্দোলনের দাবিগুলো স্পষ্ট ও দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
রাজপথে মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ
ফাহিম আহমেদ জানান, ৩ ও ৪ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিনি সরাসরি মানুষের অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেন। ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, প্রগতি সরণি ও শহীদ মিনার এলাকায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের উপস্থিতি তাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
তার মতে, সে সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষাই মানুষের মধ্যে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।
৫ আগস্টের অভিজ্ঞতা
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনায় তিনি বলেন, সকালে গুলশান-বনানী এলাকা থেকে গণভবনের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সামনে গুলির খবর পান। পরে মহাখালী এলাকায় পৌঁছানোর পর এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছ থেকে সরকারের পতনের খবর জানতে পারেন।
তার ভাষায়, সেটি শুধু একটি সরকারের পতনের ঘটনা ছিল না; বরং নতুন সম্ভাবনার সূচনার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
তরুণদের সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব
জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফাহিম আহমেদ বলেন, একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ সমাজ। তিনি মনে করেন, সাহস, সংগঠন এবং ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা, ন্যায্য মূল্যায়ন এবং সমান সুযোগ। জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা সেই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।


