২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও আন্দোলনের মূল দাবি—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং কার্যকর সংস্কার—এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কারে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারানো শত শত মানুষ এবং আহত হাজারো নাগরিকের আত্মত্যাগ স্মরণ করে তারা বলেন, এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা যেখানে নাগরিকের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে। তবে দুই বছর পরও সেই লক্ষ্য অর্জনে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন
গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন, অসংখ্য সুপারিশ এবং একাধিক অধ্যাদেশ জারি হলেও, আলোচিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন হয়নি বলে মত বিশ্লেষকদের।
বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচারক নিয়োগ ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হয়নি বলে তারা উল্লেখ করেন।
তাদের মতে, ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক সংস্কার সম্ভব নয়।
সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে বিতর্ক
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং বিচার বিভাগের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজন
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল আইনি সংস্কার যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে একটি কার্যকর সামাজিক ও রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে তুলতে হবে।
তারা বলেন, যেকোনো মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার
প্রবন্ধে শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের মতে, মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এ জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের আহ্বান
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতিদান
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া মানুষের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে তখনই, যখন রাষ্ট্রে আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং নাগরিক অধিকার কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
তাদের ভাষায়, জুলাই কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতীক। সেই লক্ষ্য পূরণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জাতীয় ঐক্য এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠানগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।


