২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে রাজধানী ঢাকা ছিল কারফিউ, সংঘাত, রক্তপাত এবং জনরোষে উত্তাল। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থান, সহিংসতার আশঙ্কা এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। সেই দিনগুলোতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় একদিকে আতঙ্ক, অন্যদিকে পরিবর্তনের দাবিতে মানুষের অভূতপূর্ব প্রতিরোধ।
সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। গণভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর আশপাশে কাঁটাতারের ব্যারিকেড, সামরিক যান এবং সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক এলাকায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ও সংঘর্ষ
ঢাকার আসাদগেট, ধানমন্ডি, পান্থপথ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, রামপুরা, শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় সরকারসমর্থক কর্মী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। কোথাও কোথাও সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং হামলার ঘটনাও ঘটে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা এবং গুলির ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীর বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে অবস্থান নেয়।
শাহবাগে মানুষের ঢল
দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগ এলাকায় হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পেশাজীবী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে জড়ো হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুরো এলাকায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিল দৃঢ় অবস্থান এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশা।
এ সময় আহতদের হাসপাতালে নেওয়া, স্বেচ্ছাসেবকদের পানি বিতরণ এবং সাধারণ মানুষের সহায়তার বিভিন্ন চিত্রও দেখা যায়।
হতাহতের খবর
দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গুলিবিদ্ধ ও হতাহতের খবর আসতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষের পর নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও হাসপাতাল সূত্রে সেদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানির তথ্য প্রকাশিত হয়, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে।
কারফিউ উপেক্ষা করে রাজপথে মানুষ
সন্ধ্যায় কারফিউ কার্যকর হলেও রাজধানীর অনেক এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, কলাবাগান, রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় ছোট ছোট মিছিল, স্লোগান এবং মানুষের জটলা লক্ষ্য করা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অনেকেই কারফিউ উপেক্ষা করে রাজপথে অবস্থান নেন। বিভিন্ন এলাকায় পোড়া যানবাহন, ধোঁয়া এবং সংঘর্ষের চিহ্ন দেখা যায়।
অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষার রাত
সন্ধ্যার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ বিরাজ করে। দোকানপাট অধিকাংশই বন্ধ ছিল এবং সীমিত সংখ্যক যানবাহন চলাচল করছিল।
একই সময়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে নানা গুঞ্জন ও প্রত্যাশা। অনেকের বিশ্বাস ছিল, চলমান রাজনৈতিক সংকটের একটি বড় পরিবর্তন খুবই কাছাকাছি।
ইতিহাসের মোড় ঘোরানো অধ্যায়
পর্যবেক্ষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ের দিনগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। কারফিউ, সহিংসতা, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং জনসাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণ মিলিয়ে রাজধানী ঢাকা সেই সময়ে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়।
সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথই তৈরি করেনি; বরং রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিক অংশগ্রহণের প্রশ্নেও নতুন বাস্তবতার সূচনা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


