একটি ফোন কল। ওপাশ থেকে ভেসে আসছে পরিচিত কণ্ঠ—‘বাবা, আমি বিপদে পড়েছি। এখনই কিছু টাকা পাঠাও।’ আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার কণ্ঠে আসতে পারে জরুরি অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ। কণ্ঠস্বর এতটাই স্বাভাবিক ও পরিচিত যে সন্দেহের সুযোগও থাকে না। অথচ পরে জানা গেল, ফোনের ওপাশে থাকা ব্যক্তি আসলে সেই মানুষটি নন। কণ্ঠস্বরটি তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে।
একসময় যা কল্পবিজ্ঞানের বিষয় বলে মনে হতো, ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তির অগ্রগতিতে তা এখন বাস্তব। বিনোদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে প্রযুক্তিটির ইতিবাচক ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি এর অপব্যবহার সাইবার প্রতারণার নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
কীভাবে কাজ করে ভয়েস ক্লোনিং
এআই ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি মানুষের কণ্ঠের স্বর, উচ্চারণ, গতি, টোন ও আবেগ বিশ্লেষণ করে একটি কৃত্রিম কণ্ঠ তৈরি করতে পারে। এরপর ওই ব্যক্তির কণ্ঠে এমন বক্তব্যও তৈরি করা সম্ভব, যা তিনি কখনো বলেননি।
জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অল্প সময়ের অডিও নমুনা ব্যবহার করেও এখন বেশ বাস্তবসম্মত কণ্ঠস্বর তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও, সাক্ষাৎকার কিংবা অন্যান্য অডিও থেকেও অপরাধীরা সম্ভাব্য কণ্ঠের নমুনা সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে।
ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে
ভয়েস ক্লোনিংয়ের ব্যবহার শুধু প্রতারণায় সীমাবদ্ধ নয়। চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশনে ডাবিং, অডিওবুক তৈরি এবং ভিডিও গেমের চরিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার কাজ আরও সহজ ও দ্রুত হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা আরও গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার কারণে কথা বলার সক্ষমতা হারানো ব্যক্তির আগের কণ্ঠস্বরের আদলে যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। শিক্ষা খাতেও বিভিন্ন ভাষায় একই বক্তার কণ্ঠে পাঠ বা শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাইবার প্রতারণায় বাড়ছে ঝুঁকি
প্রযুক্তিটির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এর অপব্যবহার। অপরাধীরা পরিবারের সদস্য, বন্ধু, ব্যাংক কর্মকর্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিচয়ে ফোন করে অর্থ দাবি বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
পরিচিত কারও কণ্ঠ শুনে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেটিকে বিশ্বাস করতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে দ্রুত অর্থ পাঠানোর চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে। একইভাবে ব্যাংকিং তথ্য, পাসওয়ার্ড বা অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য আদায়ের চেষ্টাও চালানো সম্ভব।
করপোরেট দুনিয়াতেও উদ্বেগ
প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও ভয়েস ক্লোনিং নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কণ্ঠ নকল করে কর্মীকে অর্থ স্থানান্তর, ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন কিংবা সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া সম্ভব।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু কণ্ঠস্বর শুনে পরিচয় নিশ্চিত করা নিরাপদ নয়। কারণ আগে যেখানে কণ্ঠস্বরকে একটি কার্যকর পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন সেটিও নকল করা সম্ভব।
রাজনীতি ও গণমাধ্যমে অপব্যবহারের আশঙ্কা
ভয়েস ক্লোনিংয়ের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত ও আর্থিক প্রতারণায় সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রিয় ব্যক্তি কিংবা সংবাদ উপস্থাপকের কণ্ঠ নকল করে ভুয়া বক্তব্য তৈরি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
নির্বাচন, জনমত এবং সামাজিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে এ ধরনের ভুয়া অডিও ব্যবহার করা হলে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে অডিওর সত্যতা যাচাই এবং ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
কীভাবে প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকবেন
পরিচিত কারও কণ্ঠ শুনেই কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ফোনে জরুরি অর্থ পাঠানোর অনুরোধ এলে কলটি কেটে দিয়ে পরিচিত অন্য নম্বরে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করা যেতে পারে। সম্ভব হলে ভিডিও কলের মাধ্যমেও পরিচয় যাচাই করা উচিত।
পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আগে থেকেই একটি গোপন কোডওয়ার্ড বা যাচাইকরণ পদ্ধতি নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে শুধু কণ্ঠস্বরের ওপর নির্ভর না করে পরিচয় নিশ্চিত করার অতিরিক্ত একটি স্তর তৈরি হয়।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ
ভয়েস ক্লোনিংয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গবেষকেরাও কাজ করছেন। বিভিন্ন এআই প্ল্যাটফর্মে কণ্ঠস্বর ব্যবহারের আগে অনুমতি নেওয়া এবং অপব্যবহার সীমিত করার মতো ব্যবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি এআই-নির্মিত অডিও শনাক্ত করতে বিভিন্ন ডিটেকশন প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা চলছে।
তবে এআই যত উন্নত হচ্ছে, নকল কণ্ঠ তৈরির কৌশলও তত পরিশীলিত হচ্ছে। ফলে কোনো একটি প্রযুক্তিগত সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যবহারকারীর সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশেও বাড়তে পারে ঝুঁকি
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অনলাইন ব্যবসা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে এআইভিত্তিক ভয়েস প্রতারণার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের এ বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে অস্বাভাবিক আর্থিক অনুরোধ, জরুরি নির্দেশনা বা সন্দেহজনক অডিওর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
এআই ভয়েস ক্লোনিং একদিকে প্রযুক্তির অসাধারণ সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, অন্যদিকে পরিচয় যাচাইয়ের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ভবিষ্যতে তাই শুধু চোখে দেখা তথ্য নয়, কানে শোনা কণ্ঠস্বরের সত্যতাও যাচাই করতে হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পরিচিত কণ্ঠস্বরও যে নিখুঁত ছদ্মবেশ হতে পারে—সাইবার নিরাপত্তায় এটিই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।



