Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিএআইয়ের নকশায় তৈরি নতুন ভাইরাস

এআইয়ের নকশায় তৈরি নতুন ভাইরাস

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার এখন আর সফটওয়্যার, ছবি কিংবা লেখা তৈরিতে সীমাবদ্ধ নেই। জীববিজ্ঞানের জটিল ক্ষেত্রেও দ্রুত প্রবেশ করছে এই প্রযুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণা সেই সম্ভাবনারই নতুন দৃষ্টান্ত সামনে এনেছে।

গবেষকরা জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে নতুন কিছু ভাইরাসের জিনোম নকশা তৈরি করেছেন, যেগুলো গবেষণাগারে কার্যকর ব্যাকটেরিওফাজ হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। এসব ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত ও ধ্বংস করতে পারে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, এআই শুধু বিদ্যমান জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ নয়, নতুন জিনোমের নকশা তৈরিতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এআই দিয়ে নতুন জিনোমের নকশা

গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে Evo সিরিজের জিনোম-ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। Evo-1 ও আরও উন্নত Evo-2 মডেল জিনগত তথ্যের কাঠামো এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে নতুন ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রস্তাব করতে পারে।

মডেলটির প্রশিক্ষণে বিপুলসংখ্যক প্রোক্যারিওটিক ও ব্যাকটেরিওফাজ জিনোম এবং ডিএনএ সিকোয়েন্স ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের সংক্রমণ ঘটাতে পারে এমন ভাইরাসের জিনগত তথ্য প্রশিক্ষণ উপাত্ত থেকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল বলে গবেষণাসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।

লক্ষ্য ছিল ব্যাকটেরিওফাজ তৈরি

গবেষণায় ব্যাকটেরিওফাজ ΦX174-কে জৈবিক রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লক্ষ্য ছিল Escherichia coli বা E. coli ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে সক্ষম নতুন ফাজের জিনোম নকশা তৈরি করা।

উদ্দেশ্য ছিল কোনো প্রাকৃতিক ভাইরাসের হুবহু অনুলিপি তৈরি করা নয়। বরং প্রাকৃতিক জিনোমের কার্যকর কাঠামো অনুসরণ করে নতুন সিকোয়েন্স তৈরি করা। এআই বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য নকশা দেওয়ার পর সেগুলোর একটি অংশ গবেষণাগারে সংশ্লেষণ ও পরীক্ষা করা হয়।

প্রকাশিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত শত শত নকশার মধ্যে মাত্র ১৬টি কার্যকর ব্যাকটেরিওফাজে পরিণত হয়। এসব ফাজ E. coli-কে সংক্রমিত করার পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমাতেও সক্ষম হয়েছে।

তবে এআইয়ের তৈরি অধিকাংশ নকশাই কার্যকর হয়নি। ফলে গবেষণাটিকে এখনো মূলত একটি proof of concept হিসেবে দেখা হচ্ছে—অর্থাৎ এআই দিয়ে নতুন জিনোম নকশা তৈরি করে তার কিছু অংশকে বাস্তব জীববৈজ্ঞানিক ব্যবস্থায় কার্যকর করা সম্ভব, গবেষণাটি সেটিই প্রমাণ করেছে।

অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাবনা

এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ হতে পারে ফাজ থেরাপি। ব্যাকটেরিওফাজ নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে ধ্বংস করতে পারে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও নির্দিষ্ট ফাজ তৈরিতে এআইভিত্তিক জিনোম নকশা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

তবে এটিকে এখনই প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ফাজের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, রোগীভেদে উপযুক্ত ফাজ নির্বাচন এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন—সব ক্ষেত্রেই আরও গবেষণা প্রয়োজন।

বায়োসেফটি নিয়ে নতুন প্রশ্ন

গবেষণায় তৈরি ভাইরাসগুলো ব্যাকটেরিওফাজ এবং মানুষের সংক্রমণের জন্য তৈরি করা হয়নি। গবেষকেরা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ভাইরাসের জিনগত তথ্য প্রশিক্ষণ থেকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন।

তারপরও গবেষণাটি বায়োসেফটি ও বায়োসিকিউরিটি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, কম্পিউটারে জেনারেটিভ এআই দিয়ে তৈরি জিনগত নকশার একটি অংশ বাস্তব জৈবিক ব্যবস্থায় কার্যকর হতে পারে।

এআইয়ের সক্ষমতা যত বাড়বে, ততই কম্পিউটারভিত্তিক জিনোম নকশা এবং বাস্তব জীববিজ্ঞানের মধ্যে দূরত্ব কমে আসবে। ফলে গবেষণাগারে জিনগত উপাদান তৈরি ও পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে যথাযথ যাচাই, নজরদারি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

উদ্ভাবনের সঙ্গে বাড়াতে হবে নিয়ন্ত্রণ

গবেষণাটি জীববিজ্ঞানে এআইয়ের সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। একই প্রযুক্তি একদিকে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে নতুন চিকিৎসা কৌশল তৈরিতে সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে এর অপব্যবহার নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও তৈরি করতে পারে।

এ কারণে এআইনির্ভর জীববিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বায়োসেফটি, বায়োসিকিউরিটি, গবেষণা-নজরদারি এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের নীতিমালাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, স্ট্যানফোর্ড ও আর্ক ইনস্টিটিউটের এই গবেষণা দেখিয়েছে-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে জীববিজ্ঞানের নকশা ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। এটি চিকিৎসা ও জীবপ্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুললেও একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, শক্তিশালী এই প্রযুক্তির ব্যবহার যেন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পাশাপাশি নিরাপদ ও দায়িত্বশীলও থাকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

জনপ্রিয় সংবাদ

সাম্প্রতিক মন্তব্য