Homeদৈনিক সংবাদজাতীয়প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে মানবপাচার, ভুয়া চাকরি ও অনলাইন প্রতারণার ফাঁদে তরুণরা

প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে মানবপাচার, ভুয়া চাকরি ও অনলাইন প্রতারণার ফাঁদে তরুণরা

প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে মানবপাচারের কৌশলও। সীমান্তপথ বা দালালনির্ভর প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, জাল ওয়েবসাইট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মানুষকে টার্গেট করছে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি, প্রেম কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে সাইবার প্রতারণা, অনলাইন স্ক্যাম, জোরপূর্বক শ্রম এবং আধুনিক দাসত্বে বাধ্য করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ফলে মানবপাচার এখন কেবল সীমান্তঘেঁষা অপরাধ নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর, আন্তঃদেশীয় এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।

ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনে বাড়ছে প্রতারণা

প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচারের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে বিদেশে চাকরির লোভনীয় বিজ্ঞাপন। ফেসবুক, লিংকডইন, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব দিয়ে তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করা হচ্ছে।

মানবিক উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চাকরির প্রলোভনে যাওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, ৯০ শতাংশকে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ, আর্থিক জালিয়াতি বা সাইবার স্ক্যাম পরিচালনায় বাধ্য করা হয়েছে। অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন পাচারকারীদের বড় অস্ত্র

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, পাচারকারী চক্রগুলো ভুয়া পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিদেশে বিলাসবহুল জীবন, উচ্চ বেতনের চাকরি কিংবা ব্যবসার সুযোগ দেখিয়ে মানুষের আস্থা অর্জনের পর অর্থ হাতিয়ে নেওয়া বা বিদেশে পাচারের ঘটনা বাড়ছে।

প্রেম ও বিয়ের প্রলোভনেও বাড়ছে ঝুঁকি

চাকরির পাশাপাশি অনলাইন প্রেম ও বিয়ের প্রস্তাবও এখন মানবপাচারের অন্যতম কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ রেখে বিশ্বাস অর্জনের পর বিদেশে একসঙ্গে বসবাস বা বিয়ের আশ্বাস দিয়ে বিশেষ করে নারীদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরে তাদের অনেকেই যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম অথবা অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্যও উঠে এসেছে।

কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টারে বাংলাদেশিরা

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন।

তবে তাদের একটি অংশ প্রতিশ্রুত চাকরি না পেয়ে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েছেন। চলতি বছরের জুন মাসে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরে আসেন। তাদের অনেকেই অভিযোগ করেন, বিদেশে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয় এবং অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ ও আর্থিক জালিয়াতিতে বাধ্য করা হয়।

মিয়ানমারেও একই চিত্র

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকাও আন্তর্জাতিক সাইবার স্ক্যাম চক্রের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তি বা কলসেন্টারের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে তরুণদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরে তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন জব্দ করে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে। অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

রোহিঙ্গারাও ঝুঁকির মধ্যে

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও মানবপাচারের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন। চাকরি, বিয়ে কিংবা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা করছে সংঘবদ্ধ চক্র। একই ধরনের কৌশলে বাংলাদেশি নাগরিকদেরও টার্গেট করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোই এখন মানবপাচার প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। তারা বিদেশে চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন।

এছাড়া অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক তথ্য, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড শেয়ার না করা, সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ এড়িয়ে চলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের ভিত্তিতে বিদেশে যাওয়া বা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) চালু রাখা এবং অপরিচিত অ্যাপ বা সফটওয়্যার ইনস্টল না করারও পরামর্শ দিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments