মানুষের মস্তিষ্কের মতো তথ্য গ্রহণ, বিশ্লেষণ ও স্মৃতি ধারণে সক্ষম প্রযুক্তি তৈরির লক্ষ্যে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম সিন্যাপস (Artificial Synapse) গবেষণা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও বুদ্ধিমান রোবট, শক্তি-সাশ্রয়ী কম্পিউটার এবং উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বর্তমানের অধিকাংশ কৃত্রিম সিন্যাপস সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধরনের সংকেতের ওপর কাজ করে। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক একই সময়ে চোখ, কান, ত্বক, নাক ও জিহ্বা থেকে আসা বিভিন্ন তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে। সেই সক্ষমতাকে অনুকরণ করেই এখন তৈরি হচ্ছে বহুমাত্রিক কৃত্রিম সিন্যাপস, যা বৈদ্যুতিক সংকেতের পাশাপাশি আলো, শব্দ, তাপমাত্রা, গ্যাস ও অন্যান্য পরিবেশগত উদ্দীপনার প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম।
মানুষের মস্তিষ্কের মতো শেখার সক্ষমতা
কৃত্রিম সিন্যাপসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি। অর্থাৎ কোনো উদ্দীপনার ফলে ডিভাইসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয় এবং উদ্দীপনা শেষ হওয়ার পরও সেই পরিবর্তনের প্রভাব কিছু সময় ধরে বজায় থাকে। গবেষকদের মতে, এটি মানুষের মস্তিষ্কে স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।
অসংখ্য কৃত্রিম সিন্যাপসকে একত্রে সংযুক্ত করে নিউরোমরফিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব, যেখানে তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ একই কাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন হয়। এতে প্রচলিত কম্পিউটারের মতো প্রসেসর ও মেমরির মধ্যে বারবার তথ্য আদান-প্রদানের প্রয়োজন কমে যেতে পারে এবং শক্তি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব হবে।
মেমরিস্টর: কৃত্রিম সিন্যাপসের মূল প্রযুক্তি
কৃত্রিম সিন্যাপসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মেমরিস্টর (Memristor)। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে এর রোধ পরিবর্তিত হয় এবং বিদ্যুৎ সরিয়ে নেওয়ার পরও সেই পরিবর্তন কিছু সময় ধরে বজায় থাকে। ফলে এটি একই সঙ্গে তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের কাজ করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অক্সিজেন আয়ন, রূপা (Ag⁺) কিংবা তামা (Cu²⁺)-এর মতো ধাতব আয়নের স্থানান্তরের মাধ্যমে ডিভাইসের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র পরিবাহী পথ তৈরি হয়, যা রোধের পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো, অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারে বিপুলসংখ্যক মেমরিস্টর একটি চিপে সংযুক্ত করা সম্ভব।
দ্রুত, শক্তি-সাশ্রয়ী ও উন্নত কর্মক্ষমতা
বিজ্ঞানীরা হেক্সাগোনাল বোরন নাইট্রাইড (h-BN), GST (Ge₂Sb₂Te₅) এবং MoTe₂-এর মতো উন্নত উপাদান ব্যবহার করে আরও কম শক্তি ব্যয়ে কাজ করতে সক্ষম কৃত্রিম সিন্যাপস তৈরির চেষ্টা করছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, h-BN-ভিত্তিক একটি কৃত্রিম সিন্যাপস মাত্র ৬০০ পিকোওয়াট শক্তি ব্যবহার করে এবং ১০ ন্যানোসেকেন্ডেরও কম সময়ে সুইচিং সম্পন্ন করতে পারে। অন্যদিকে MoTe₂-ভিত্তিক ডিভাইসে মাত্র ৯০ মিলিভোল্ট সুইচিং ভোল্টেজ এবং প্রায় ১৫০ অ্যাটোজুল শক্তি প্রয়োজন হয়, যা নিউরোমরফিক কম্পিউটিংয়ের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
আলো দিয়েও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
কৃত্রিম সিন্যাপসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপ্টোইলেকট্রনিক প্রযুক্তি। এ ধরনের ডিভাইসে বৈদ্যুতিক সংকেতের পাশাপাশি আলো ব্যবহার করেও তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে ক্যামেরা ও আলোকসংবেদী সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনেক দ্রুত বিশ্লেষণ করা যাবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম দৃষ্টি (Artificial Vision) প্রযুক্তির উন্নয়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যতের রোবট হবে আরও মানবসদৃশ
গবেষকদের ধারণা, বহুমাত্রিক কৃত্রিম সিন্যাপসের মাধ্যমে এমন রোবট তৈরি করা সম্ভব হবে, যা মানুষের মতো একই সঙ্গে দেখতে, শুনতে, স্পর্শ অনুভব করতে, তাপমাত্রা শনাক্ত করতে এবং রাসায়নিক সংকেত বিশ্লেষণ করতে পারবে।
এসব তথ্য যদি একই নিউরোমরফিক ব্যবস্থায় একযোগে প্রক্রিয়াকরণ করা যায়, তাহলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি শক্তি ব্যবহারের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম সিন্যাপস প্রযুক্তি ভবিষ্যতে স্বয়ংচালিত যানবাহন, স্মার্ট ক্যামেরা, শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, চিকিৎসা-সহায়ক রোবট, কৃত্রিম দৃষ্টি, উন্নত সেন্সর এবং মানব-মেশিন যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
তাদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি অনুকরণে সক্ষম এই প্রযুক্তি আগামী প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটিং ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।


