ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) রেকর্ড মুনাফা করেছে বিশ্বের শীর্ষ আটটি তেল কোম্পানি। মাত্র তিন মাসে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১২৬ ডলারের বেশি ওঠে। এর ফলে বিশ্বের বড় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল আর্থিক সুবিধা পায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সৌদি আরবের আরামকো, বিপি, শেল, ইকুইনর, টোটালএনার্জিস, এনি, শেভরন এবং এক্সনমোবিল—এই আট প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মুনাফা এপ্রিল থেকে জুন সময়ে প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। গত বছরের একই সময়ে তাদের মোট মুনাফা ছিল ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও কম।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত মুনাফা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সময়ে তারা প্রতি মিনিটে ৭ লাখ ডলারেরও বেশি মুনাফা করেছে।
এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলো অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করছে। তাদের দাবি, এই অতিরিক্ত আয়ের একটি বড় অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করা উচিত।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
আরামকোর মুনাফা সর্বোচ্চ
দ্বিতীয় প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো। প্রতিষ্ঠানটির নিট আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে।
ইরানি ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরামকোর কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রবৃদ্ধি থেমে থাকেনি।
কার্বন নিঃসরণ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কার্বন মেজরস-এর তথ্য অনুযায়ী, ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে আরামকো। তালিকায় পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে শেভরন ও এক্সনমোবিল। শেল ও বিপিও বিশ্বের শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে।
বিপি, শেল, শেভরন ও এক্সনমোবিলেরও রেকর্ড আয়
দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিপির মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক আয়। আগের প্রান্তিকে তাদের মুনাফা ছিল ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
শেল জানিয়েছে, একই সময়ে তাদের নিট আয় হয়েছে ৯ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার, যা কোম্পানিটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা।
নরওয়ের ইকুইনর দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
অন্যদিকে, মার্কিন তেল জায়ান্ট শেভরন দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং এক্সনমোবিল ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর এক্সনমোবিলের এটিই সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক আয়।
জলবায়ু সংকটের মধ্যেই বাড়ছে মুনাফা
তেল কোম্পানিগুলোর রেকর্ড মুনাফার সময়েই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা ও বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল উইটনেস-এর জীবাশ্ম জ্বালানি বিভাগের প্রধান প্যাট্রিক গ্যালি বলেন, যখন বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ জলবায়ু সংকট ও উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সামলাচ্ছে, তখন বড় তেল কোম্পানিগুলো মুনাফাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যায্য কর আরোপ করে সেই অর্থ জলবায়ু অভিযোজন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা উচিত।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিয়েলও সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের বিকল্প নেই।
এদিকে ইউরোপে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে রেকর্ড উচ্চ তাপমাত্রা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঘটনাগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট আটটি তেল কোম্পানির কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।


