প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, কেবল বিদেশ থেকে প্রযুক্তি কিনে ব্যবহার করলে কোনো দেশ প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভর হতে পারে না। প্রযুক্তিকে বুঝে, নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন করে এবং নতুন উদ্ভাবনের সক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়েই একটি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। আর সেই সক্ষমতা গড়ে তুলতে প্রাথমিক স্তর থেকেই স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিল্পকলা ও গণিত) শিক্ষার বিকল্প নেই।
বুধবার জাপানের ওসাকায় অনুষ্ঠিত আরটেক জেনারেল এক্সিবিশন ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি স্টেমভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করবে না; বরং প্রশ্ন করতে, সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে, সমস্যা বিশ্লেষণ করতে এবং বাস্তবসম্মত সমাধান উদ্ভাবনে দক্ষ হয়ে উঠবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি সাত কোটিরও বেশি হলেও দেশের অর্থনীতি এখনও অনেকাংশে তৈরি পোশাক শিল্পনির্ভর। বহুমুখী, জ্ঞানভিত্তিক এবং উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই স্টেম শিক্ষার শক্ত ভিত নির্মাণ জরুরি।
জাপানের উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, মেইজি পুনর্গঠন থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন—উভয় সময়েই শিক্ষা, প্রযুক্তি, শৃঙ্খলা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের মাধ্যমে জাপান নিজেদের নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বাংলাদেশও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তুলতে চায়।
তিনি জানান, সরকার বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান ও মৌলিক দক্ষতা উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিটি শিশুর জন্য শক্তিশালী শিক্ষাভিত্তি তৈরি করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
স্টেম শিক্ষার জন্য ব্যয়বহুল প্রযুক্তি অপরিহার্য নয় উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি গাছ লাগানো, পানির মান পরীক্ষা, বৃষ্টিপাত পরিমাপ, কাগজ দিয়ে সেতু নির্মাণ কিংবা স্থানীয় রাস্তা ও ড্রেনেজ সমস্যার সমাধান খোঁজার মতো কার্যক্রমও শিশুদের জন্য কার্যকর স্টেম শিক্ষার অংশ হতে পারে।
তিনি আরও জানান, পর্যায়ক্রমে দেশের বিদ্যালয়গুলোতে গণিত ল্যাব, বিজ্ঞান ক্লাব এবং মৌলিক রোবোটিক্স শিক্ষার বিস্তার ঘটানো হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক ও ব্যবহারিক পাঠদান নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরটেক জেনারেল এক্সিবিশনে প্রদর্শিত শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষণ পদ্ধতির প্রশংসা করে ববি হাজ্জাজ বলেন, এসব মডেল সহজ, ব্যবহারিক, সাশ্রয়ী এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও এগুলো সহজেই অভিযোজিত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, দ্রুত নগরায়ণ, খাদ্যনিরাপত্তা, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু তথ্যভিত্তিক শিক্ষা নয়, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময় এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বক্তব্যের শেষে প্রতিমন্ত্রী আরটেক, অক্টোব্রেইন, আয়োজক প্রতিষ্ঠান, অংশগ্রহণকারী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আগামী প্রজন্মের শিক্ষায় বিনিয়োগের মাধ্যমেই আরও উদ্ভাবনী, সহনশীল ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে ওসাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিনিধি, শিক্ষা-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক অতিথি এবং আরটেক ও অক্টোব্রেইনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


