ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং সে কারণেই সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। একই সঙ্গে তিনি মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় ঐক্য বজায় রেখে ভুল-ত্রুটি সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। হাওয়ার ওপর ভেসে এসে এখানে বসিনি। এই সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। আমরা ভুল করলে সেই ভুলের মাসুল দেব, তবে সবাই মিলে ভুল সংশোধন করতে চাই।”
জাতীয় অনুষ্ঠানের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ
অনুষ্ঠানে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রতি দুঃখ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, এ ধরনের জাতীয় আয়োজনে বিভক্তির পরিবর্তে জাতীয় ঐক্যের বার্তা তুলে ধরা উচিত ছিল। তার ভাষায়, এ দিনের সমাপ্তি প্রত্যাশিত ছিল না।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে সৃষ্ট পরিস্থিতি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। বিদেশি প্রতিনিধিদের উদ্দেশে ইংরেজিতে বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করায় তা আর সম্ভব হয়নি।
তার মন্তব্য, “বিদেশি অতিথিদের সামনে এভাবে অপদস্থ হওয়া আমাকে ব্যথিত করেছে। এতে সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন, যিনি পাশের দেশে বসে আছেন।”
‘ভুয়া’ স্লোগান নিয়ে সমালোচনা
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য চলাকালে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে অনভিপ্রেত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন আচরণ জাতীয় অনুষ্ঠানের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সকালের পৃথক অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মান জানিয়ে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনাকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছেন।
আহত জুলাই যোদ্ধাদের মর্যাদা নিশ্চিতের আহ্বান
আবেগঘন বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের যথাযথ মর্যাদা ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, আন্দোলনে দৃষ্টিশক্তি হারানো কিংবা স্থায়ীভাবে আহত ব্যক্তিদের যদি এখনও ন্যায্য সম্মান ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তবে তা জাতির জন্য লজ্জার।
তার ভাষায়, সরকারের সামর্থ্য অনুযায়ী শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও দেখভাল করা রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা
বক্তব্যে আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে খুন, গুম, নির্যাতন, অর্থপাচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দলটির মধ্যে অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, “তারা যদি দেশে আসে, রাজপথেই জনগণ তার জবাব দেবে।”
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়
নিজের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের প্রয়োজনে এখনও তিনি দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত আছেন।
তিনি বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে।”
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ উল্লেখ করে জাতীয় স্বার্থে ঐক্য, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।


